ডাঃ সেখ সাবের আলি, শ্যামসুন্দর, পূর্ব বর্ধমানঃ বাঙালি মুসলমান যাঁরা নবী রসুল করিম ( সাঃ)এর পথে জীবন যাপন করে থাকেন, মানুষের সহিত সর্বদা সু সম্পর্ক বজায় রাখেন বা মানুষের সহিত পিতা মাতা ভাই বোন সম্পর্ক কে সম্মান করেন তাঁরা মানবিক ভাবে প্রত্যেক মানুষকে বুকে জড়িয়ে নিতে পারেন, কখনো জাত পাত ছোট বড়ো বিচার করেন না এবং সামাজিক মানবিক শান্তি বজায় রাখেন তাঁরাই প্রকৃত মুসলমান। এই মোমিন মুসলমান ঈদকে সঠিক মর্যাদায় পালন করে থাকেন। এবং ঈদ কে সর্বজনীন উৎসব হিসাবে পালন করে থাকেন। শান্তির কামনা, সংযম পালন, সঠিক ভাবে দান করার জন্য এই মাসকে পবিত্র রমজান হিসাবে মুসলমানগণ পালন করে থাকেন।
ঈদ শব্দের অর্থ খোঁজ খবর করা বা খোঁজ খবর নেওয়া। মুসলমানগণ রমজান শেষে এক দিন সকলে মিলে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় জমায়েত বা মিলিত হয়ে পাড়া প্রতিবেশীর খোঁজখবর নেওয়া কে বলা হয় ঈদ উৎসব।(সকল মানুষের শুভ কামনায় নামাজ আদায় করা) এক মাস মুসলমান নরনারী ভোরে উঠে সেহরি খায় তারপর নামাজ আদায় করে দিন আরম্ভ করেন। সারা দিন পানি পর্যন্ত গ্ৰহণ , এমন কি বেহিসাবি খরচ করতে ও পারবেনা। নামাজ করা নাপাক দূর করা এবং উজু গোছল করার জন্য যে টুকু প্রয়োজন, তার বেশি নয়। ইচ্ছা মতো পানি ব্যবহার করতে পারবেন না ,এটা কোরান হাদিস শাস্ত্র মতে চিরন্তন সত্য।
দিন যাপনের কাজ ছাড়া, শুধু ইবাদত বা নামাজ আদায় করাই ফরজ। দিনের শেষে আদা লবন খেজুর সাদা পানি খেয়ে রোজা ইফতার করা হয়। তারপর নামাজ আদায় করা, ইবাদত করা হলে প্রয়োজন মতো পানি খাবার গ্ৰহণ করতে পারেন। এই ভাবে মুসলমান নরনারী একমাস রোজা পালন করে থাকেন। ( যাঁদের শারীরিক মানসিক রোজা করার সামর্থ্য নাই, তাঁরা রোজা না ও করতে পারবেন।
রোজা শব্দের অর্থ, র অর্থে নূর,জ্যেতি বা আলো। জা অর্থে জাগিয়ে তোলা , জারিত হওয়া এটাই চেতনা, রোজা। মুসলমানগণ সারা জীবন পাঁচ ওয়াক্তের নামাজের মধ্যে দিয়ে বা মুরশিদি জেকেরের মধ্যে দিয়ে আল্লাহ রাসুল নবীর পথ অনুসরণ করে থাকেন। বিশেষ করে রমজান মাস ইবাদতের মাস হিসাবে আল্লাহ নির্ধারণ করেছেন। প্রকৃত মুসলমান নিজেকে আল্লাহর নবী রাসুল সাল্লাল্লাহুর পথে জীবন সমর্পণ করেছেন। আত্মসমর্পণ করাই ইসলাম, শান্তির বার্তা বাহক ইমামদার মুসলমান। ভোরে সেহরি খেয়ে সারা দিন না খেয়ে থাকা রোজা নয়, রোজা সংযম, রোজা দান, রোজা শান্তির পথে চলতে নির্দেশ করে। শরীরের প্রত্যেক অঙ্গকে সংযম রাখার যে ফজিলত আল্লাহ দান করেছেন,তাহা পালন করা যদি সঠিক হয় ,তবে আত্মোসন্তুষ্টির মধ্যে রোজার উদ্দেশ্য সফল হবে বা আল্লাহ তা কবুল করবেন। একজন রোজদার মুসলমানের চলার পথে – পাড়া প্রতিবেশী মনঃক্ষুন্ন হয় বা কষ্ট পায়, তবে রোজার সওয়াব হতে বঞ্চিত হবেন ( আল্লাহর ইচ্ছা)।
রোজার মূল উদ্দেশ্য সামাজিক মানবিক ভাবে সকল জীবকে সাহায্য করা, মানুষের পাশে থেকে তাদের সুখ দুঃখের সাথি হওয়া, নিজ নিজ আয়ের বরাদ্দ অংশ (হাদীস মতে) গরীব দুঃখী মানুষের মধ্যে সাহায্য,দান করা অবশ্যই কর্তব্য। সুখের সিংহাসনে বসে, রাজকীয় আহারে আসক্ত হয়ে, রোজা করার ভান করি, সেই রোজা কখনো আন্তরিক হতে পারে না ! একমাস মাটিতে আসন পেতে, অতি সাধারণ হয়ে জীবন যাপন, রোজা পালন করে সমব্যথী হতে পারি, মানুষের প্রতি খোঁজ খবর নিয়ে আত্মিক ভাবে রোজা পালন করে আত্মোপলব্ধি হয়, তবে ঈদ পালন,হয়তো সার্থক হবে।
ঈদের মাস, রমজান মাস দান ধ্যান ও ইবাদতের জন্য উল্লেখযোগ্য। দুহাত ভরে দান করতে হবে, কোন ফলের আশা না করে, দান করাই হলো আসল দান। দান যিনি করেন , তিনি দাতা; আর যিনি দান গ্ৰহণ করেন তিনি দান গ্ৰহীতা । এই দাতা ও গ্রহীতার মধ্যে আত্মিক সম্পর্ক না থাকে , তবে এই দান কবুল হবে না (গুরু বাক্য) ।অতএব দান গ্ৰহণ করার অধিকার থাকা প্রয়োজন আছে। কোন অর্থশালী ব্যক্তি, নিজের অহং প্রতিপত্তি জাহির করার জন্য কিছু দান করেন বা ঈদ উপলক্ষে ইফতারে ফলাহার সামগ্ৰী দান করেন বা বাড়িতে দাওয়াত দেন ইফতারের জন্য, সেই দান বা ইফতার কখনো কবুল হবে না। রমজান অর্থাৎ নিজেকে পুড়িয়ে শুদ্ধ করতে হবে, অহংকার, আমিত্বকে রোজা আগুনে পুড়িয়ে অতিসাধারণ মানুষ হিসেবে গোড়ে তুলতে হবে, তবে দাতা গ্ৰহীতার মধ্যে আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠবে। আল্লাহ সর্ব উত্তম রূপে রোজা কবুল করবেন।
ঈদের দিন ঈদের নামাজ পড়ে প্রত্যেকে প্রত্যেকের সাথে কাঁধে কাঁধে, বুকের সাথে বুকের মিলনে – চলার পথে, পিছনে, পাশাপাশি যে হিংসা দ্বন্দ্ব বিদ্বেষ ছিল মহব্বতের আগুনে পুড়িয়ে ভালোবাসার পবিত্র পানিতে ধুয়ে মুছে যায় , ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আগামী দিনের পথ চলা শুরু হয়। ছোটদের দুয়া শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন পবিত্র নতুন আলোয় আলোকিত হয়। হিন্দু মুসলিম বলে কিছু নাই, মানুষের পরিচয়,মানব জাতির পরিচয় বড়ো হয় । জাতের নিকৃষ্টতম বেড়া ভেঙে খাওয়া দাওয়া আন্তরিক মিলনে সর্ব্বজনীন ঈদ মোবারক উৎসব পালিত হয়।
আত্মসমর্পণকারী মুসলমান, ইসলাম শান্তির ধারক ,বার্তা বাহক এবং শান্তি রক্ষক । নবী রাসুল সাঃ বিশ্বশান্তির বার্তা দিয়ে গেছেন, শান্তি বজায় রাখার নিয়ম নমুনার পথ দেখিয়ে গেছেন, এই পথকে মানুষ (যে কোয়াম বা সম্প্রদায়ের হোক) অনুসরণ করেন, তবে জাত ধর্মের বিভেদ লড়াই কখনো সমাজে থাকবে ন। সামাজিক শান্তি, বিশ্বশান্তি অবশ্যই বজায় থাকবে, ঈদ সর্বজনীন, বিশ্বশান্তির প্রতীক। বিশ্বমানবের জন্য ঈদ কবুল করুন। আমিন।
পোশাক, চলার পথ , হোক ভিন্ন ভিন্ন/ ক্ষতি নাই তায়,/ মানুষ জাতী এক মায়ের সন্তান/ এই বোধকে জাগায় । এক আল্লাহ ঈশ্বরের পরম করুণা’তে/ জীবের জন্ম হয় ,/ এক আল্লাহ ঈশ্বরের চূড়ান্ত ইশারায়/ জীবের মৃত্যু হয়। জাত পাত বৃথা স্বার্থের লড়াই/মানবতা হারিয়ে যায়,/ মানুষে মানুষে সূর্য চন্দ্র হলে / মানবিক শান্তি রক্ষা পায়। মানবিক হয়ে ঈদ পালন করি/ মানুষ সবাই সমান,/ হিংসা বিদ্বেষ ধর্মের রাজনীতি ছেড়ে/ শান্তির পথে আনো ঈমান।